চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিতে সফল কুড়িগ্রামের তিন যুবক

উদ্দোক্তা ও সাফল্যের গল্প breaking subled

নিউজ ডেষ্ক- মাচায় ঝুলছে তরমুজ। কোনোটি হলুদ রঙের, কোনোটি সবুজ আবার কোনোটি কালো। মৌসুম না হলেও পরীক্ষামূলক তরমুজ চাষে সফলতা পেয়েছেন কুড়িগ্রামের উলিপুরের তিন যুবক। অসময়ে তরমুজ চাষে ফলন পেয়ে উচ্ছ্বসিত তারা।

উপজেলার পৌর এলাকার নারিকেলবাড়ি গ্রামে এক একর স্থানজুড়ে গড়া প্রকল্পের কিছু অংশে শতাধিক তরমুজ চারা থেকে পরিপক্ব তরমুজ পেয়েছেন এসব উদ্যোক্তা। এমন সফলতায় তারা তরমুজ চাষ প্রকল্প সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের আবহাওয়ায় জানুয়ারি থেকে এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে তরমুজ চাষ হয়। এটিই তরমুজের প্রধান মৌসুম। তবে এই সময়ের বাইরেও বাজারে তরমুজ পাওয়া যাচ্ছে। এগুলোকে অনেকে ‘বারোমাসি’ তরমুজ নাম দিয়েছেন।

তিন উদ্যোক্তার নাম মারুফ আহমেদ, ফিরোজ আলম মন্ডল ও ফারুক হোসেন। তিন জনই উলিপুরের বাসিন্দা। তাদের মধ্যে মারুফ আহমেদ ২০১৬ সা‌লে বগুড়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থে‌কে খ‌নি বিদ্যায় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন ক‌রেন, ফারুক হোসেন স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন এবং ফিরোজ আলম মন্ডল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।

কুড়িগ্রাম-কৃষি-৫
তাদের মাচায় ঝুলছে হলুদ রঙের তরমুজ
উলিপুর পৌর শহর থেকে দুই কিলোমিটার পূর্বে নারিকেলবাড়ি গ্রাম। ওই গ্রামে প্রায় এক একর আবাদি জমি নিয়ে গড়ে তুলেছেন সিড বাজার-২ এগ্রো নামে সবজি চাষ প্রকল্প। হলুদ, কালো আর ডোরাকাটা সবুজ রঙের তিন প্রজাতের তরমুজ ঝুলছে প্রকল্পের একটি বেডের মাচায়। শুধু তরমুজ নয়, প্রকল্পজুড়ে আছে শসা, করলা, বরবটি, চাল কুমড়াসহ হরেক রকম সবজি। এছাড়া পরীক্ষামূলকভাবে বারোমাসি সজনের চাষও করেছেন এই উদ্যোক্তারা। লক্ষ্য, উপার্জনের পাশাপাশি ভোক্তাদের মাঝে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ।

কথা হয় উদ্যোক্তাদের একজন মারুফ আহমেদের সঙ্গে। মারুফ জানান, তাদের তিন জনের মধ্যে তিনি ও ফারুক হোসেন পড়াশোনা শেষ করে কৃষি নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর মতের মিল থাকায় চাকরিজীবী হলেও ফিরোজ আলম তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার সিদ্ধান্ত নেন। প্রাথমিকভাবে ফিরোজ আলমের পৈতৃক জমি ভাড়া নিয়ে প্রকল্প শুরু করা হয়েছে। প্রথম বছরেই অকল্পনীয় সফলতা পাওয়ায় প্রকল্প সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছেন তারা।

কুড়িগ্রাম-কৃষি-৪
পরীক্ষামূলক তরমুজ চাষে সফলতা পেয়েছেন তারা
মারুফ বলেন, ‘আমরা সব সবজিতেই সফলতা পেয়েছি। পরীক্ষামূলকভাবে তরমুজ চাষ করে আমরা যে সফলতা পেয়েছি, তা অভাবনীয়। প্রকল্পের এক একর জমির একটি অংশে প্রায় ১০০ তরমুজ বীজ বপন করে যে চারা পেয়েছি, সেগুলোর প্রতিটিতে ফলন এসেছে। ইতোমধ্যে তরমুজ পাকতে শুরু করেছে। এ বছর আমরা রঙিলা, রংধনু ও সুগার কিং নামে তিন জাতের তরমুজ চাষ করেছি। তরমুজগুলো আকার ও ওজনে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কিছুটা ছোট হলেও নগণ্য নয়। প্রতিটি তরমুজের ওজন দেড় থেকে দুই কেজি। রঙ ও স্বাদও দারুণ।’

বীজ বপনের পর ৯০ থেকে ১০০ দিনের মধ্যে ফল পেতে শুরু করেছেন বলেও জানান এই কৃষি উদ্যোক্তা।

‘শুধু তরমুজ নয়, আমরা প্রকল্পে বিভিন্ন জাতের সবজি চাষ করে সফলতা পেয়েছি। লাউ, চাল কুমড়া, বরবটি, শসাসহ বিভিন্ন সবজি আমরা বাজারজাত শুরু করেছি। প্রাথমিকভাবে উলিপুরকেন্দ্রিক বাজারজাত করলেও আগামীতে উপজেলা ও জেলার বাইরে সবজি সরবরাহ করবো। এজন্য প্রকল্পে স্থানীয় আগ্রহী তরুণদেরও প্রশিক্ষণ দিয়ে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’ প্রকল্প নিয়ে নিজেদের ভবিষ্যত চিন্তা প্রসঙ্গে বলেন মারুফ।

কুড়িগ্রাম-কৃষি-৩
হলুদ, কালো আর ডোরাকাটা সবুজ রঙের তিন প্রজাতের তরমুজ ঝুলছে প্রকল্পের মাচায়
প্রকল্পের আরেক উদ্যোক্তা ফারুক আহমেদ। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বীজ প্রযুক্তি বিষয়ে স্নাতকোত্তর করা এই উদ্যোক্তা চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেকে কৃষক পরিচয়ে পরিচিত করতে চান। নিজের অর্জিত কৃষিজ্ঞান কৃষি ও কৃষকের কল্যাণে নিয়োগ করতেই গ্রামে ফিরে কৃষিতে আত্মনিয়োগ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি ছাত্রজীবন থেকেই বীজ নিয়ে কাজ করি। বিশেষত ছাদকৃষির জন্য অনেকের কাছে আমি বীজ সরবরাহ করে আসছি। এখন এলাকায় ফিরে কৃষি নিয়ে কাজ করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা পরীক্ষামূলকভাবে তিন জাতের তরমুজ বীজ বপন করেছি। আমরা দেখতে চেয়েছিলাম, মৌসুম ছাড়া সারা বছর তরমুজের ফলন পাওয়া যায় কিনা। প্রাথমিকভাবে আমরা সফল। প্রতিটি তরমুজ আমরা দেড়শ টাকা করে বিক্রি করছি। অসময়ে ফলন পাওয়ার পর আমরা আবারও কিছুটা বৃহৎ পরিসরে তরমুজ বীজ বপন শুরু করেছি।’

কুড়িগ্রাম-কৃষি-২
প্রকল্পজুড়ে আছে শসা, করলা, বরবটি, চাল কুমড়াসহ হরেক রকম সবজি
প্রকল্পে চাষ করা সবজি নিরাপদ দাবি করে এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘আমরা বলছি না যে, কীটনাশক ব্যবহার করি না। কারণ কীটনাশক ছাড়া বর্তমানে চাষাবাদ করা প্রায় অসম্ভব। আমরা পরিমিত মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করি। পাশাপাশি জৈব বালাইনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা সীমিত কীটনাশক ব্যবহার করি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—ফসল উত্তোলনের অন্তত ৭ থেকে ১৫ দিন আগে থেকে আমরা কীটনাশক স্প্রে বন্ধ করে দিই। ফলে ভোক্তার হাতে যখন ফসল পৌঁছায় তখন তা বিষমুক্ত ও নিরাপদ থাকছে।’

উদ্যোক্তা মারুফ আহমেদ বলেন, ‘ফারুক ভাই থাকায় আমাদেরকে কৃষি বিভাগের সহায়তা নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। আর সঙ্গে ইন্টারনেট তো আছেই। আমাদের লক্ষ্য আগামীতে প্রকল্প আরও সম্প্রসারিত করা।’

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *